ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতে ভয়াবহ দুর্নীতি-অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। ক্রয় চুক্তির নামে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিক, আমলা ও রাজনীতিকদের যোগসাজশে এসব হয়েছে বলে মনে করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত চুক্তি পর্যালোচনা কমিটি। তাদের দাবি, দুর্নীতির কারণেই প্রতিযোগিতার চেয়ে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ২৫ শতাংশ, ভর্তুকি বাদ দিলে তা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সাড়ে চার গুণ বাড়লেও আওয়ামী লীগের দেড় দশকে ব্যয় বেড়েছে ১১ গুণ। এসব ব্যয় বৃদ্ধি ও অনিয়মের পেছনে সংঘবদ্ধ দুর্নীতিই মুখ্য ভূমিকা রেখেছে বলে কমিটির অভিমত। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে করা চুক্তিতেও।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে গতকাল এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন জমা দিয়েছে চুক্তি পর্যালোচনা কমিটি। সেখানেই এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে অবশ্য আগামী জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লেগে যাবে বলে কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়।
দায়মুক্তি আইন হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগের আমলে করা বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইনটি গত বছরের নভেম্বরে বাতিল করা হয়। এর আগেই বিতর্কিত আইনটির অধীনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে শেখ হাসিনা সরকারের করা চুক্তিগুলো পর্যালোচনায় গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এতে আহ্বায়ক হিসেবে আছেন হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী। কমিটির বাকি সদস্যরা হলেন বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও সহ-উপাচার্য আবদুল হাসিব চৌধুরী, কেপিএমজি বাংলাদেশের সাবেক প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) আলী আশফাক, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ফ্যাকাল্টি অব ল অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সের অর্থনীতির অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক।
দীর্ঘ তদন্ত শেষে তারা গতকাল অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। প্রতিবেদন জমার পর মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন কমিটির সদস্যরা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানও।
প্রতিবেদন হাতে পেয়ে মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘একটি নিরপেক্ষ ও স্বতন্ত্র প্রতিবেদন তৈরির জন্য সরকারের বাইরে বিশিষ্টজনদের দিয়ে এ কমিটি করা হয়েছে, যাতে কোনো প্রশ্ন না ওঠে। কমিটিতে যারা আছেন তাদের দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই।’
কমিটির সদস্যরা জানান, বিশেষ আইনের অধীনে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি অনুমোদন করে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন সংস্থা এসব চুক্তির অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ ক্ষতি করে জনগণ ও করদাতাদের ওপর এ খরচের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ চুক্তিতেও ভয়াবহ দুর্নীতি হয়েছে। এ দুর্নীতি অনুসন্ধানের মাধ্যমে খুঁজে বের করতে হবে। বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো সরকারের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভাড়া বাবদ অর্থ নিয়েছে, যেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহের চেয়ে দুর্নীতিই ছিল মুখ্য। তারা আরো বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি আইনটি করাই হয়েছে দুর্নীতির জন্য। এখানে সংঘবদ্ধ দুর্নীতি হয়েছে। বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিগুলো ভাড়া আদায়ের নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে কাজ করেছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো জ্বালানি আমদানি করেছে নিজেরা। এতেও দুর্নীতি হয়েছে।
বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির প্রতিবেদনের সঙ্গে কমিটি আদানির সঙ্গে করা চুক্তির অনিয়ম নিয়েও একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তাতে ভারতীয় এ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে দুর্নীতি-অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার কথা তুলে ধরেছে কমিটি।
জাতীয় কমিটির সদস্যরা বলেন, আদানির চুক্তি বাতিল করার পর যদি জেতার সম্ভাবনা থাকে তাহলে অবশ্যই বাতিলের সুপারিশ করা হবে। ৩০ শতাংশ জেতার সম্ভাবনা থাকলে আমরা আদালতে যাব না। যদি দেখি আইনগতভাবে ৮০ শতাংশ জেতার সম্ভাবনা রয়েছে, তাহলে অবশ্যই পরামর্শ দেব সরকারকে। তবে আগেই সব তথ্য প্রকাশ করলে অনেক ক্ষতি হতে পারে। তাই সব কথা বলতে চাই না।
চুক্তি বাতিল প্রসঙ্গে জাতীয় কমিটির সদস্য আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, ‘চুক্তি শুধু বাতিল করার যথেষ্ট গ্রাউন্ড রয়েছে। আমরা এখানে বাতিল করলাম, কিন্তু তারা আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে পারে। সেখানে ৫ বিলিয়ন ডলার দাবি করতে পারে। বাতিল না করলে এখন যে ক্ষতি হচ্ছে তার চেয়ে দশগুণ-বিশগুণ গচ্চা যেতে পারে। তাই বুঝেশুনে চুক্তি বাতিলের দিকে যেতে হবে।’
কমিটির আহ্বায়ক মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘চুক্তি কতটা বাতিল করা যাবে, তা ভবিষ্যৎ বলে দেবে। বিদ্যুৎ খাতের চুক্তিগুলো পুরোপুরি কারিগরি, তাই সময় লেগেছে পর্যালোচনায়। এতে ব্যাপক দুর্নীতি পাওয়া গেছে। আগামী জানুয়ারির মাঝামাঝি চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে।’
কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, ‘যে চুক্তিগুলো হয়েছে সেগুলো সার্বভৌম চুক্তি। একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে একটি কোম্পানির চুক্তি সই হয়েছে। সার্বভৌম চুক্তি আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত। যদি মনে হয় এখানে কোনো কারচুপি হয়েছে, আপনি ইচ্ছামতো এটাকে বাতিল করতে পারবেন না। এটা বাতিল করলে আপনার ওপর অনেক বড় জরিমানা আসবে আন্তর্জাতিক আদালত থেকে। এজন্য আমাদের অনেক সময় লেগেছে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখা যে প্রক্রিয়াগুলো কী ছিল। সেখানে কোথায় ব্যতিক্রম হয়েছে। আমরা যে বিষয়গুলো পেয়েছি এর সবকিছু অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে নেই। কারণ কিছু কিছু জিনিস চলমান। সেজন্য সেগুলোকে প্রকাশ করিনি। আপনারা মাস খানেকের মধ্যে আরো অনেক দুর্নীতির তথ্য পাবেন।’
ক্রয় চুক্তিতে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘এ দুর্নীতি আমাদের রোধ করতেই হবে। এরই মধ্যে আমাদের দেশে বিদ্যুতের দাম আমাদের প্রতিযোগীদের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি। এর প্রধান কারণ দুর্নীতি। ভর্তুকি সরিয়ে দিলে এটা হয়তো ৪০ শতাংশ হয়ে যাবে। এ রকম চলতে থাকলে বাংলাদেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান টিকতে পারবে না এ বিদ্যুতের দামে। তাই আমাদের এসব চুক্তি শোধরাতেই হবে।’
মোশতাক হোসেন আরো বলেন, ‘প্রতিবেদনে আছে কোথায় কোথায় ভুল হয়েছে, হস্তক্ষেপ করা হয়েছে, ওপর থেকে হুকুম এসেছে। প্রশাসন সবসময় নির্দোষ ছিল তাও না, সেটারও প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মাশুলটা দিচ্ছে সাধারণ ভোক্তা-ক্রেতা-করদাতারা। আমাদের ওপরে চাপিয়ে দিয়ে তারা চলে গেছে। এই যে বিশাল অংকের ঋণ ও বেশি দামের বিদ্যুৎ চাপিয়ে দিয়ে যারা এখান থেকে টাকা নিয়ে চলে গেছে তাদের বোঝাতে হবে আপনারা এটা থেকে পার পাবেন না। আমরা প্রমাণ সংগ্রহ করছি, অ্যাকশন নেয়া হবে। ভবিষ্যতে যাতে এটা আর না হয়। এটা অনেক কঠিন কাজ।’
বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ও অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘দেড় দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে ৪ দশমিক ৪ গুণ, কিন্তু বিল পরিশোধ হয়েছে ১১ দশমিক ১ গুণ। ২০১০-১১ অর্থবছরে বিদ্যুতের বিল পরিশোধ হয়েছে ৬৩৮ মিলিয়ন ডলার, অর্থবছর ২০২৩-২৪-এ এসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে। কাদের টাকা পরিশোধ করছে, এর বিপরীতে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ পাচ্ছি সে হিসাব মেলানো যায় না, সেটাই আমাদের মূল উপাত্ত। বিশেষ বিধান আইনে বারবার মেয়াদ বাড়ানো হলো, বারবার দায়মুক্তির পথ খুলে গেল। এছাড়া আছে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূতকরণ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় সবসময় প্রধানমন্ত্রীর অধীনে ছিল। প্রধানমন্ত্রীর অফিস এবং অন্যান্য মিলিয়ে ওখানেও একটা সমস্যা আছে।’
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা ফাওজুল কবির বলেন, ‘আদানির চুক্তিতে যদি কোনো রকম অনিয়ম পাওয়া যায়, তাহলে বাতিল করতে দ্বিধা করব না। আর চুক্তি বাতিল করা যায় দুটি উপায়ে। প্রথমত কোনো কারণ দেখিয়ে, দ্বিতীয়ত কারণ ছাড়া। কারণ ছাড়া চুক্তি বাতিল করলে তার ক্ষতিপূরণের বিষয়টি চুক্তিতেই বলা আছে। তবে প্রতিটি চুক্তিতেই স্বীকারোক্তি থাকে যে এ চুক্তিতে কোনো দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া হয়নি। এটা যদি লঙ্ঘিত হয়, তাহলে চুক্তি বাতিল করা যায়। কিন্তু মুখের কথা তো আদালত মানতে চাইবেন না, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিতে হবে আদালতে। কমিটির সহায়তায় চুক্তির অনিয়ম খুঁজে দেখা হচ্ছে। কারণ খুঁজে পাওয়া গেলে চুক্তি বাতিলে দ্বিধা করা হবে না।’
আমলাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হলে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, ‘সবার সহযোগিতা পেলে দুদকের (দুর্নীতি দমন কমিশন) মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সব তথ্য দুদকের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। তবে বিভাগীয়ভাবে করার তেমন কিছু নেই কারণ অনেকেই চাকরি ছেড়েছেন।’